বারবার ব্যর্থ হয়েও মালয়েশিয়ায় শ্রমিক থেকে শিল্পপতি হাফেজ হুসাইন


admin প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৫, ২০২৫, ৪:২২ অপরাহ্ণ /
বারবার ব্যর্থ হয়েও মালয়েশিয়ায় শ্রমিক থেকে শিল্পপতি হাফেজ হুসাইন

মোস্তাকিম জনি, মালয়েশিয়া থেকে:
পিতার রেখে যাওয়া শেষ সম্বল জমি বিক্রি করে স্বচ্ছল জীবনের আশায় ২০০৮ সালে কলিং ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ গ্রামের অনাথ যুবক হাফেজ হুসাইন আহমাদ। পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা বুকে ধারণ করা এই তরুণ কওমি মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা গ্রহণের পর প্রথমে মসজিদের ইমামতি দিয়ে জীবনের পথচলা শুরু করেন।

মালয়েশিয়ায় এসে শুরুতে এক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ নেন তিনি। কিন্তু দৃঢ় মনোবলের অধিকারী হাফেজ হুসাইন কর্মজীবনের পাশাপাশি ব্যবসায় বিনিয়োগের চেষ্টা শুরু করেন। একাধিকবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, হারিয়েছেন সমস্ত পুঁজি। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। বারবার ঘুরে দাঁড়িয়ে আজ তিনি হয়েছেন সফল শিল্পপতি।

দীর্ঘ এক যুগের নিরলস পরিশ্রমের ফলস্বরূপ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘উই ওয়ান এগ্রো গ্রুপ অব কোম্পানি’, যেখানে এখন কর্মরত প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

শুধু মালয়েশিয়ায় নয়, তিনি এখন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অংশীদার হতে চান। নিজ এলাকায় রেমিট্যান্স পাঠিয়ে গড়ে তুলেছেন মসজিদ, মাদ্রাসা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি প্রায় আড়াই কোটি টাকার একাধিক বাড়ি ও স্থাপনা ইসলামের খেদমতের উদ্দেশ্যে কওমি আলেম খোবাইব আহমাদ সিরাজীকে হাদিয়া হিসেবে দান করেছেন।

হাফেজ হুসাইনের প্রবাস জীবন বাংলাদেশের প্রবাসীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে তিনি প্রমাণ করেছেন— অধ্যবসায়, সততা ও দৃঢ় সংকল্প থাকলে প্রবাসেও সফলতা সম্ভব।

বর্তমানে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে কুয়ালা সেলাঙ্গরে ৭০ একর (প্রায় ২৫০ বিঘা) জমির ওপর তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল কৃষি প্রকল্প “উই ওয়ান এগ্রো ফুড ভিলেজ”। এখানে রয়েছে দেশি-বিদেশি গরু ও হাঁস-মুরগির খামার, বাংলাদেশি সবজি ও মাছের খামার, নির্মাণসংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি কার্যক্রমসহ নানা উদ্যোগ।

এই যৌথ ব্যবসা উদ্যোগে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ উভয় দেশই উপকৃত হচ্ছে— একদিকে যেমন রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে, তেমনি মালয়েশিয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান, আর বাড়ছে দেশটির সরকারের রাজস্ব আয়ও।

বর্তমানে দেশটিতে বৈধ-অবৈধ মিলে প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী বিভিন্ন খাতে কর্মরত। তাদের অনেকেই মালয়েশিয়ার স্থানীয় খাবারে অভ্যস্ত নন। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশি খাবারের চাহিদা পূরণে মাছ-মাংস-সবজি সরাসরি আমদানি করতে হতো। এখন মালয়েশিয়ার আবহাওয়া ও মাটির সাথে খাপ খাইয়ে স্থানীয়ভাবে এসব উৎপাদন করা হচ্ছে— যার নেতৃত্বে আছেন হাফেজ হুসাইনদের মতো দূরদর্শী প্রবাসী উদ্যোক্তারা।

তারা মনে করেন, যদি মালয়েশিয়ার জটিল ভিসা নীতি সহজ করা হয়, তবে দেশটিতে আরও অনেক বাংলাদেশি ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। এতে যেমন মালয়েশিয়া উপকৃত হবে, তেমনি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও আসবে নতুন সম্ভাবনা।